দেশের শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন মানসম্পন্ন জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় পণ্য উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটছে, ফলে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ।
রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই মিলনায়তনে গতকাল ‘বাংলাদেশের শিল্প খাতে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক ফোকাস গ্রুপ আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন। ডিসিসিআই ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গবেষণা কাউন্সিলের (বিইপিআরসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেন।
সভায় ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটছে, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।’ জ্বালানি ব্যবহারে অভ্যাসগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার বিষয় উল্লেখ করে তিনি শিল্প-কারখানায় নিয়মিত ‘এনার্জি অডিট’ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি খাতভিত্তিক গবেষণায় শিক্ষা খাতকে সম্পৃক্তকরণ ও ইন্ডাস্ট্রি ম্যাপিং করার আহ্বান জানান।
সভায় সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, ‘দেশে জ্বালানি দক্ষতা নিয়ে এখনো সুস্পষ্ট নীতিমালা ও কর্মপরিকল্পনা নেই, তাই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।’ বিদ্যমান মাস্টারপ্ল্যানগুলো বাস্তবায়নে পর্যবেক্ষণ জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি। সেই সঙ্গে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বৃদ্ধি এবং জ্বালানির সংজ্ঞাগত বিভ্রান্তি দূর করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
বিইপিআরসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেন বলেন, ‘জ্বালানিবিষয়ক সরকারি তথ্য ও সেবাপ্রাপ্তিতে গ্যাপ রয়েছে। ফলে এ-বিষয়ক সরকারি বিভিন্ন সেবা সম্পর্কে দেশের বেসরকারি খাত অবগত নয়, এটি দূর করতে হবে।’
দেশের বেসরকারি খাতের আর্থিক সক্ষমতা বেশ বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জ্বালানিবিষয়ক গবেষণা কার্যক্রমে অর্থায়নে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে। এর মাধ্যমে এ খাতে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার ও ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধিসহ সর্বোপরি একটি টেকসই ব্যবসাবান্ধব জ্বালানি পরিকল্পনা প্রণয়ন সক্ষম হবে।’
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও নিউএজ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহীম বলেন, ‘বড় শিল্প-কারখানায় জ্বালানির সরবরাহ থাকলেও এসএমই খাত জ্বালানির অভাবে বিপর্যস্ত।’ তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক হ্রাসের দাবি জানান তিনি।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (অপারেশন) মো. রফিকুল আলম বলেন, ‘সরকার এলএনজিতে ভর্তুকি দিচ্ছে, কিন্তু জনসচেতনতা বাড়িয়ে ৫-১৫ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব।’ নবায়নযোগ্য উৎস, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর জোর দেন তিনি।
বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, শিল্প খাতে ২৭ শতাংশ জ্বালানি ব্যবহৃত হয়, যা ২০৫০ সালে ৪০ শতাংশে পৌঁছতে পারে। তাই এখনই দক্ষ ব্যবহারে উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
পেট্রোবাংলার মহাব্যবস্থাপক মো. ইমাম উদ্দিন শেখ জানান, দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ হচ্ছে ২৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
বাপেক্সের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আহসানুল আমিন জানান, জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০টি কূপ খননের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
বিভিন্ন শিল্প সংগঠনের নেতারা সভায় অংশ নিয়ে জ্বালানির সংকট, উচ্চমূল্য, শুল্ক বাধা, এলএনজি-নির্ভরতা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, ‘গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে দৈনিক ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে, এতে দৈনিক ৪-৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে।’ ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে পারলে ২২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব বলেও জানান তিনি।
সভায় সানেমের পক্ষ থেকে একটি গবেষণা উপস্থাপনায় শিল্প খাতে জ্বালানি দক্ষতার বর্তমান চিত্র, প্রযুক্তির ব্যবহার, স্ট্যান্ডার্ডাইজড পরিমাপের অভাব এবং অনিয়মিত সরবরাহের প্রভাব তুলে ধরা হয়।
মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ কমিশন, স্রেডা, পিডিবি, পেট্রোবাংলা, ডেসকো, ইডকল, বিসিএমএ, বিপিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিজিএমইএ, ফার্মা ও স্টিল খাতের নেতারা এবং এনার্জিপ্যাকের সিইও। সভায় ডিসিসিআইর ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি মো. সালিম সোলায়মান এবং পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।